সততার সাথে - সততার পথে

করোনা সংকটে ভারতকে সংকটমুক্ত করতে সবার দায়িত্ব এবং কর্তব্য

ভারতবর্ষে করোনা সংক্রমিতের সংখ্যা ২৩ লক্ষ পেরিয়ে গেছে। প্রতিদিনই রেকর্ড সংখ্যক নতুন মানুষ সংক্রমিত হয়ে চলেছেন। অ্যাক্টিভ সংক্রমিতের সংখ্যা আগেই ৬ লক্ষ পেরিয়ে গেছে। ১৬ লক্ষ-এর বেশি মানুষ চিকিৎসার মাধ্যমে ঠিকও হয়েছেন। মারা গেছেন প্রায় ৪৬ হাজার জন। আইসিএমআর এর রিপোর্ট অনুযায়ী গত ৬ তারিখ অবধি ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৭৮৩ জনের স্যাম্পল টেস্ট করা হয়েছে।

বিগত দিনে ঝাড়খণ্ডের বিজেপি কর্তারা রাজ্যপালের কাছে রাজ্যের বর্তমান হেমন্ত সরেন-এর কংগ্রেস পরিচালিত সরকার, করোনা সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে। ঠিকভাবে পর্যালোচনা করলে কমবেশি করে ভারতবর্ষের প্রায় সব কটি রাজ্যেরই একই রকম চিত্র দেখা যাবে। একে অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে চলেছে। আরও দেখা যাবে বিভিন্ন রাজ্য সরকার সত্যিকার অর্থেই করোনা সংক্রমণকে আটকাতে ব্যর্থ হয়েছে, আর এখানে জনগণের অবিবেচক ভূমিকাকেউ মাথায় রাখতে হবে। সামাজিক দূরত্বকে সঠিকভাবে না মানাও সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলা যেতে পারে। এই সংক্রমণের যোগ্য ভ্যাকসিন মানুষের হাতে এখনো পর্যন্ত আসেনি।

ভারত সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রালয় প্রতিদিন সকালে করানো সংক্রমণের সংখ্যা জারি করে, সেখানে কত নতুন মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, কত লোক মারা গেলেন, কত লোক সুস্থ হয়ে উঠলেন সমস্ত কিছু বলা থাকে। কিন্তু প্রতিদিনই নতুন সংক্রমন রেকর্ড সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। প্রত্যেক দিনের বেড়ে ওঠা সংখ্যা আমাদেরকে সংক্রমণ কাবু করা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নতুন রোগীর সংখ্যার সাথে সাথে মৃতের সংখ্যার অনুপাতও ভারতবর্ষে ধীরে ধীরে বাড়ছে যদিও তা অন্য দেশের থেকে কম। ভারতের মৃত্যু দর ২.০৭ শতাংশ, অর্থাৎ ১০,০০০ সংক্রমিতের মধ্যে মারা যান ২০৭ জন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এই সংখ্যা ৩.৮% অর্থাৎ প্রতি ১০ হাজারে ৩৮০ জন মারা যান।

ভারতের মৃত্যুর সংখ্যা কম হলেও আমাদের মাথায় রাখতে হবে মানুষ তো মারা যাচ্ছেন! যে বাড়ির লোক চলে যাচ্ছেন তাদের পরিবার-পরিজন সত্যিকার অর্থেই মানসিক কষ্টে ভুগছেন, তাদের মানসিক কষ্ট অন্যেরা কেমন করে বুঝবে? সংক্রমণ যখন আরো বাড়বে মৃত্যুর সংখ্যাও তো অনেক বেড়ে যাবে। তাই ভারতের মৃত্যুর শতাংশ কম বলে কেউই নিজের দায়িত্ব এড়াতে পারবে না।

দিল্লির সুপ্রসিদ্ধ স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালের সিনিয়র ফিজিশিয়ান ডক্টর এম বলি জানিয়েছেন, “বিভিন্ন জায়গার সরকার সংক্রমণ ও মৃত্যুদরকে কম দেখালেও অনেক রাজ্যেই সচেতনতা ও দায়িত্বজ্ঞানের অভাবে করোনা সংক্রমণ মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যাচ্ছে। ভ্যাকসিন আপাতত আসার সম্ভাবনা কম তাই মানুষকে মাস্কের সাহায্য নিয়ে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতেই হবে। কেউ যদি একটার বদলে দুটো মাস্ক পরেন তাহলে তো আরো ভালো”।

গবেষণা বলছে হওয়ার মাধ্যমেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ হচ্ছে । “কাউন্সিল ফর সাইন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ” এর অনুসারে আগামীতে ওয়েটিং রুম, হাসপাতাল করিডোর, আইসিইউ প্রভৃতি এলাকার বাতাসের স্যাম্পল নেওয়া হবে এবং হাওয়াতে ভাইরাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হবে।

করোনা এবং করোনার সংক্রমণের সাথে সাথে আরেকটি বিষয় গবেষকদের চিন্তার কারণ বাড়িয়ে দিয়েছে, তা হলো মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে বর্তমান সময়ে অনেকাংশেই প্রভাবিত করে ফেলেছে। বেশ কয়েক জায়গায় কিছু রোগী আত্মহত্যা করেছেন অথবা আত্মহত্যা করবার চেষ্টা করেছেন। অনেক রোগী ঠিক হবার পরেও স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে আসতে সময় নিয়েছেন, ভুগছেন ডিপ্রেশনে। দিল্লির প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল AIIMS-এর মনোচিকিৎসক ডক্টর রশিদ গৌরী জানিয়েছেন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য আগেও খারাপ ছিল কিন্তু বর্তমানে এই সংক্রমণের কারণে এবং মিডিয়া প্রচারের জন্য তা সবার সামনে বড় অকারে চলে এসেছে। সামাজিক আইসোলেশনের জন্য সামাজিক দূরত্ব বেড়ে গেছে, মানুষ নিজেকে একা মনে করছেন, এটি মানসিক ডিপ্রেশন বাড়ানোর একটি বড় কারণ।

সন্দেহ নেই এই করোনা সংক্রমণ মানবজাতির মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক বন্ধন, অর্থব্যবস্থা, আরো অনেক কিছুকে ধ্বংস করেছে। আপাতত এই সংকট থেকে বেরোনোর কোন যোগ্য রাস্তা পাওয়া যাচ্ছে না। কেবলমাত্র ভ্যাকসিন একটি বড় সমাধান হতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সরকারের তরফ থেকে যদি অত্যাধুনিক স্বাস্থ্যসুবিধা রোগীকে দেওয়া যায় তাহলে সমাজ অনেক বেশি উপকৃত হবে। দিল্লির উদাহরণ এক্ষেত্রে আমাদের কাজে আসতে পারে- প্রথমে সেখানে ব্যবস্থা খারাপ থাকলেও ক্রমেই দিল্লি সরকার তা অনেকটাই ঠিক করে ফেলেছে। কোভিদ হাসপাতালে অনেক বেড খালি পড়ে রয়েছে। দিল্লির মতো ব্যবস্থা ভারতবর্ষের অন্য রাজ্যগুলোতে নেই। কর্ণাটক, অন্ধপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারের মত রাজ্যে রোগীর ঠিক হবার সংখ্যাও অনেক কম। সরকার এবং জনতাকে একই সাথে সবাইকে সাহায্য করে নিজের নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে, তবেই আমরা এই সংকট থেকে বের হতে পারব।

আমাদের কর্তব্যের মধ্যে থাকবে- সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, করোনাকে একেবারেই হালকাভাবে না নেওয়া, মাস্ক পরা, মানুষে মানুষে দুই গজ দূরত্বকে বাধ্যতামূলকভাবে মেনে চলা, ব্যায়াম করা, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, পুষ্টিকর আহার গ্রহণ করা আর এমন উপায় করা যাতে আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা সর্বোচ্চ স্তরে উঠে আসে।

আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনের গবেষণা বলছে যদি করোনাকালে সমস্ত আমেরিকাবাসী কেবলমাত্র মাস্ক পড়া শুরু করে দেয় তাহলে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত আমেরিকাতে ৬৫ হাজার মানুষের মৃত্যু কমে যেতে পারে। কেবলমাত্র মাস্ক এর দৌলতেই যদি এতগুলি মূল্যবান প্রাণ যদি বাঁচতে পারে তাহলে ভারতবর্ষের মানুষের মাক্স পড়তে অসুবিধা কোথায়? এখনো মানবজাতিকে লম্বা লড়াই লড়তে হবে।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

Your email address will not be published.